# শিল্পপতির অফিসে গুলি বর্ষণ, সুজন সহসভতিকে হত্যা
# গুলি ও কুপিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে চাঁদা-ঝুট দখলের চেষ্টা
# সব ঘটনাই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে: অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার
গাজীপুর প্রতিবেদক
৭ মার্চ রাত পৌনে ৮টা। কয়েক’শ রোজাদারের সাথে মসজিদে ইফতার শেষে নিজ অফিসে বসে ছিলেন টঙ্গীর সাতাইশ এলাকার বাসিন্দা শিল্পপতি মো. কামররুজ্জামান। হঠাৎ চার যুবক বাগানবাড়ি এলাকায় ওই অফিসের নীচে গিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে খোঁজতে থাকেন কামরুজ্জামানকে। একপর্যায়ে কর্মচারিদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পর তিন রাউন্ড গুলি ও একটি ককটেল বিষ্ফোরণ ঘটনায়। এতে ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান অল্পের জন্য বেঁচে গেলেও এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয় আতংক। ঘটনার ৭ দিন পেরিয়ে গেলেও জড়িতদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। উন্মোচন করতে পারেনি ঘটনার পিছনের কারণ।
৪ মার্চ রাত সাড়ে ১১টা। জয়দেবপুর-ধীরাশ্রম-টঙ্গী সড়কের পাশে ধীরাশ্রম এলাকার একটি মাঠ থেকে উদ্ধার হয় গাজীপুর জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সহসভাপতি আমরুজ্জামান মোল্লার কম্বলে মোড়ানো হাত-পা বাঁধা লাশ। তিনি ওইদিন সকালে মামলা সংক্রান্ত একটি কাজে ঢাকার উত্তরার বাসা থেকে গাজীপুর আদালতে এসেছিলেন। বিকেল থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পায় পরিবারের লোকজন। এ ঘটনায় পরদিন নিহতের ছেলে কৌশিক জামান বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনারও এখনো রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি আইনশৃংখলা বাহিনী।
শুধু ওই দুই ঘটনা নয়, ঈদকে সামনে রেখে অস্ত্রধারী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের দৌড়াত্ম বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে ব্যবসায়ী মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে। গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, এসব ঘটনার নেপথ্যে চাঁদাবাজি ও কল-কারখানার প্রতিষ্ঠানের ঝুট বা ব্যবসা দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একাধিক গ্রুপ । অপরাধ ঘটিয়ে দ্রæত নিরাপদ স্থাসে সটকে পড়ছে। থেকে যাচ্ছে ধরা ছোয়ার বাইরে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও আত্মগোপনে চলে যায়। এ সময় গাজীপুরের অনেক শীর্ষসন্ত্রাসী জামিনে জেল থেকে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। এরপর থেকেই তারা আত্মগোপনে থেকে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিতে একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও কয়েকটি ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে জেলা-হাজতে পাঠিয়েছে পুলিশ। তবে বিএনপি সরকার গঠনের পর অস্ত্রধারী, সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
জানা গেছে, টঙ্গীর সাতাইশ এলাকায় শিল্পপতির অফিসের গুলির ঘটনার সময় সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন নিরাপত্তাকর্মী নান্টু মিয়। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা প্রথমে এসে প্রতিষ্ঠানের মালিকের নাম ধরে অশ্লীল গালাগাল শুরু করে এবং অবস্থান জানতে চায়। তিনি প্রতিবাদ করলে তারা গুলি ছুড়তে শুরু করে। তাদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছিল ওরা কোনও সাধারণ সন্ত্রাসী না। সবার কাছেই ছিল আগ্নেয়াস্ত্র। গাড়িতে ছিল আরও ৩ জন। এ ঘটনা ঘটিয়ে এখান থেকে পালানোর সুযোগ খুব কম। তার পরও তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
শিল্পপতি মো. কামনরুজ্জামান বলেন, ‘পুরোনো শত্রুরাই আমাকে হত্যা করতে চেয়েছে। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে ওইদিন বেঁচে গেছিল। আমার ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠছে কয়েকটি গ্রুপ। তাদের পরিকল্পনায় আমাকে হত্যা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে’।
৮ মার্চ রাতে নগরীর গাছা থানার গাজীপুরা এলাকায় একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তিন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে পৌনে ২ লাখ টাকা ছিনতাই করে দুর্র্বত্তরা। এর আগে গত ২৫ জানুয়ারি বিকেলে নগরীর চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় ককটেল ফাটিয়ে ও এজেন্ট ব্যাংকের দুই কর্মচারীকে মারধর করে ২৪ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। ডাচ্–বাংলা এজেন্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপক হাবিবুর রহমান ও তাঁর এক সহকারী ওই টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য যাচ্ছিলেন। কাজিমউদ্দিন চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়ের কাছে এসে পৌঁছালে দুই–তিনটি মোটরসাইকেলে এসে ছিনতাইকারীরা তাঁদের গতি রোধ করে। একপর্যায়ে কয়েকটি ককটেল ফাটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে টাকা বহনকারী দুজনকে মারধর করে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। আলোচিত ওই দুই ঘটনায় পুলিশ টাকা উদ্ধার বা জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
১০ মার্চ সকালে গাজীপুর সদরের নেসলে ফুড কারখানার ব্যবসা নিয়ে দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে স্থানীয় দুইপক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের ৪ জন গুরুতর আহত হয়। এ ঘটনায় কারখানার সুপারভাইজার জালাল উদ্দিন ও স্থানীয় নজরুল ইসলাম বাদি হয়ে পাল্টাপাল্টি দুইটি মামলা দায়ের করেছেন।
ঝুট ব্যবসার দ্বন্দ্বে গত ৭ মার্চ দুইপক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে নগরীর বাসন থানার ভিটিপাড়া এলাকায় অবস্থিত ম্যানাল ফ্যাশনের সামনে। দেশীয় অস্ত্র ও পিস্তল নিয়ে দুই পক্ষের মহড়ার সিসি ক্যামেরার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
গাজীপুর মহানগর পলিশের অতিরিক্ত কমিশনার তাহেরুল হক চৌহান কালের কন্ঠকে বলেন, প্রতিটি ঘটনার নিবিড় তদন্ত চলছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেশন করে দেখা গেছে সুজন সহসভাপতিকে মহাসড়কের পাশে কম্বলে পিচিয়ে ফেলা হয়েছে রাত ৯টার দিকে। তার সাথে থাকা ব্যাগ জয়দেবপুর রেল স্টেশনের কাছে একটি পরিত্যাক্ত ডোবায় ফেলা হয় রাত ১১টায়। পুলিশ ব্যাগটি উদ্ধার করেছে। তার কল লিষ্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে আদালত থেকে বের হয়ে বিকেল তিনটা পর্যন্ত তিনি জেলা প্রশাসকের ছিলেন। এরপর তার অবস্থান দেখা যায় নগরীর হাড়িনাল এলাকায়। তার কিছুক্ষণ পর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সুজন সহসভাতি কামরুজ্জামান মোল্লা ও শিল্পপতি কামরুজ্জমানের অফিসে গুলি বর্ষণের ঘটনা পুলিশ ছাড়াও আইনর্শৃংখলা বাহিনীর একাধিক টিম তদন্ত করছে। শিঘ্রই অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারীদের ধরতে জিএমপি সাড়াশি অভিযান শুরু করেছে। গত তিন দিনে শতঅধিক ছিনতাইকারী, মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী গ্রেপ্তার হয়েছে। সন্ত্রাসীদের ধরতে এরই মধ্যে আমরা জিরো ট্রলারেন্স নীতিতে কাজ করছি।




