মঙ্গলবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২১ইংরেজী, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বাংলা

ওসি পরিচয়ে হামেশা নারী নির্যাতন করে আসছে সোহরাব

রিপোর্ট:এম রানা

২০২১-১০-২১ ১০:০২:২৯ /

প্রায় তিন বছর পূর্বে পুলিশের চাকুরি থেকে অবসর নিয়েছেন। অথচ এখনো ওসি পরিচয়ে দিয়ে একের পর এক অপরাধ করতে দ্বিধা করছে না সাবেক পুলিশ পরিদর্শক ও কথিত ওসি মোঃ সোহরাফ হোসেন। পরিবারে সবাই পুলিশে চাকুরি করে বিধায় মানুষকে মানুষ মনে করেন না তিনি। তার ছেলে মামুন বর্তমানে পুলিশের (এসআই), ছেলের স্ত্রীও পুলিশের এসআই ও মেয়ের জামাই পুলিশ পরিদর্শক এবং তিনিও অবসর প্রাপ্ত একজন পুলিশ পরিদর্শক। সোহরাব কখনোই ওসি ছিলেন না। অথচ নিজেকে ওসি পরিচয়ে চলেন এলাকায়। ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতিনিয়ত অসহায় নারীদের বিনা দোষে শারীরিক নির্যাতন করে আসছেন তিনি। কথিত ওই ওসি এক সময় পুলিশের পোশাক পড়ে আর হাতে ওয়ারলেস সেট নিয়ে সপ্তাহে দুই-তিন দিন কখনো এর বেশি থানা থেকে ছুটে আসতেন। এসেই তিনি বাড়ির ভাড়াটিয়াদের ডেকে বলতেন, আমি আসলে কি বলে ডাকবি তোদের জানা আছে? আমি আসলেই তোরা আমাকে স্যার বলে ডাকবি। কেউ তাকে স্যার না বলে ভাই বললেই প্রচন্ড চোটে বকাঝকা শুরু করতেন ভুয়া ওই ওসি। মনে চাইলে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে মুখেচোখে থাপ্পরও মেরে বসেন সোহরাফ হোসেন। এমন অনেক ঘটনার জন্ম দিয়েছেন অবৈধ সম্পদশালী ওই পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা। বেশ কয়েক মাস পূর্বে রাতের বেলায় বিদ্যুৎ বিল বেশি হওয়া নিয়ে মুখে বাক লড়াই হয় শাহিনুর বেগম নামে এক নারী ভাড়াটিয়ার সঙ্গে। শহিনুর বেগমের বাড়ি বরিশালে। তিনি সোহরাব হোসেনের গাজীপুর মহানগরীর আমবাগ তেতুঁলতলার মোড়ের বাড়িতে পরিবার নিয়ে ভাড়া থেকে পোশাক কারখানায় চাকুরি করিতো। শাহিনুর বেগম একদিন জানতে চান সোহরাবের কাছে গেল মাসের বিদ্যুৎ বিলের চেয়ে এ মাসের বিদ্যুৎ বিল এতো বেশি কেনো স্যার। এ কথা বলা মাত্রই নামধারী ওসি তার ভাড়াটিয়া নারীর কানে থাপ্পর মারে। এতে শাহিনুর বেগম মাটিতে লুটে পড়ে এবং তার কনে প্রচন্ড আঘাত লাগে। পরে তার আত্বীয় ঘটনাস্থলে এসে রাতেই ওই নারীকে ঔষধ কিনে দিয়ে পরিবেশ শান্ত করে। এবং নারীকে বলে ওসির সঙ্গে বাড়াবাড়ি করলে সমস্যা হবে বলে ভয় দেখিয়ে বাসা থেকে তারিয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় ওই নারী সাবেক কাউন্সিলর মো. খলিলুর রহমানের কাছে এসে অভিযোগ করেন। কাউন্সিলর খলিল বিষয়টি স্বীকার করেছেন। লাঞ্চিত শাহিনুর জানান, স্বামী সন্তান নিয়ে সোহরাফ ওসির বাড়িতে ভাড়া থেকে স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করি। বিদ্যুৎ বিল আগের মাসের চেয়ে চারশ টাকা বেশি হওয়ায় বিষয়টি জানতে চাওয়া মাত্র সোহরাফ হোসেন তাকে থাপ্পর ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং তার স্বামীকে গ্রেফতারের ভয় দেখায়। এ ঘটনা জানাজানি হলে ওই পুলিশের আত্বীয় মো. আব্দুস ছামাদ সেক্রেটারী ওই রাতেই ঘটনাস্থলে গিয়ে তার পক্ষে ক্ষমা চান এবং পরিবেশ শান্ত করে স্থানীয় একটি ফার্মাসি থেকে ঔষধ কিনে দেয়। ওই ঘটনার পর ওসি পালিয়ে যায় এবং পরের দিন গোপনে এসে শাহিনুর বেগমের কাছে ক্ষমা চান তিনি। কিছুদিন পূর্বে আমবাগ প্রাইমারি স্কুলের পূর্ব পাশে সোহরাবের অপর বাড়ির এক ভাড়াটিয়ার গর্ভবতী স্ত্রীর পেটে লাথি মারে। পরে বাড়ির সকল ভাড়াটিয়ারা মিলে গেট লাগিয়ে দিয়ে ছেলে পুলিশের এসআই মামুনের সামনেই ওই কথিত ওসি সোহরাবকেকে গণধোলাই মারে বলে জানা গেছে। এছাড়াও চলতি প্রথম সপ্তাহের দিকে আমবাগ দক্ষিণ পাড়া আলাউদ্দিন পীরের বাড়ি সংলগ্ন আলামিন নামে এক ভাড়াটিয়ার স্ত্রীর শরীরে অসৎ উদ্দেশ্যে শরীরে হাত দেয়। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে আলামিনের স্ত্রীর গালে থাপ্পর মারে। পরে ওই নারী নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে চাকু নিয়ে তাড়িয়ে ধরলে দৌড়ে পালিয়ে যায় সোহরাব। আলামিন স্থানীয় ভাবে বিচার দিলে পরে আলামিনের কাছে ক্ষমা চায় ওই ভন্ড ওসি সোহরাব। তার মার্কেটের এক ভাড়াটিয়া নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তার মার্কেটে ভাড়া নিয়ে ইলেকক্ট্রিস এর দোকান করার সময় ওই পুলিশ কর্মকর্তা ওসির ভয় দেখিয়ে মাস শেষ না হতেই তিনি ভাড়ার জন্য চাপ দিতো। ওই ভাড়াটিয়া আরো জানান, অনেক সময় পুলিশের পোশাক, হাতে ওয়ারলেস সেট নিয়ে থানা থেকে ছুটে চলে আসতো এবং মাসের ভাড়া বাদেও অগ্রিম টাকা চেয়ে বসতো। না দিলে মামলা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেয়ার ভায় দেখানো হতো। এমন অত্যাচারে কোনো কুলকিনারা না পেয়ে শেষমেষ তার আমবাগের মার্কেট ছাড়তে বাধ্য হয়েছি। অপর এক ভাড়াটিয়া জানান, যে মাসে বাসা ছেড়ে দিয়েছি সেই মাসেই তিনি দুইশ টাকা ঘরভাড়া বাড়ায়। বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় ওই বারতি দুইশ টাকা চাইলে দিতে অস্বীকার করলে ওসির ক্ষমতা দেখিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতো সোহরাফ মিয়া। ভাড়াটিয়াদের ঘরে তালা, এক মাসের ঘর ভাড়া না পেয়ে সোহরাফ মিয়া এক ভাড়াটিয়াদের ঘরে তালাঝুলিয়ে দিয়ে নির্যাতন করার অভিযোগও রয়েছে। আমবাগ তেতুঁলতলার মোড় তার বাড়িতে আব্দুল হাকিম নামে এক ভাড়াটিয়ার কাছে এক মাসের ঘরেভাড়া বাকি থাকায় তিনি ওই ঘরে তালা মেড়ে দেন। ভাড়াটিয়া আব্দুল হাকিম জানান, টাঙ্গাইলের নাগরপুর গ্রামের বাড়ি গিয়ে একটি সমস্যায় পড়ে আসতে এক মাস দেরি হয়। তিনি জানান, ওই সমস্যা সমাধান করে আমবাগ বাসায় এসে দেখেন তার বাসায় তালাঝুলানো রয়েছে। এ সময় বাকি ভাড়া দিতে চাইলে তিনি তালা খুলে না দিয়ে নানা তালবাহনা শুরু করে দেন। এভাবে প্রায় তিন ঘন্টা বাড়ির বাইরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে কোনো মতে স্থানীয় কাউন্সিলর খলিলুর রহমানের কাছে বিষয়টি জানালে পরে তিনি বিশেষ একজনকে তালাভেঙে দেয়ার হুকুম দিলে তালাভেঙে বাসায় তুলে দেন। এলাকাবাসি অভিযোগ করে বলেন, সোহরাব কোন থানার ওসি ছিলেন ? বর্তমানে তার ছেলে পুলিশের এসআই মামুন হোসেন ঢাকার ডিবিতে আছেন। তিনি আমবাগে এসেই অনেক তাপালিং শুরু করে দেয়। তিনি আমবাগের মানুষকে বোকা বানানোর উদ্দেশ্য প্রত্যেক শুক্রবারে আমবাগ সমাজ কল্যাণ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে প্রতি শুক্রবার এক হাজার টাকা দান করেন এবং খতীব সাহেবের হাতে টাকা ধরিয়ে দিয়ে নিজের নাম সোহরাব হোসেন না বলে নাম ফুটানোর জন্য নিজেকে তিনি ওসি পরিচয় দেন। এ নিয়েও আমবাগ এলাকায় হৈচৈ পড়ে যায়। কে এই কথিত ওসি সোহরাব হোসেন ? টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানার তরফপুর গ্রামের মৃত আব্দুল হালিমের ছেলে সোহরাব হোসেন। তিনি নিজ ঠিকানা গোপন করে প্রায় ৪৫-বছর পূর্বে ঢাকা জেলার সাভারের ধামাই এলাকার তৎকালিন শুকুর আলী চেয়ারম্যানের প্রশংসাপত্র নেন। এরপর ওই গ্রামে ভুয়া বাড়ি দেখিয়ে ও ভুয়া ঠিকানায় ঢাকা জেলার কোটায় পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকুরি নেন সোহরাব। তার বেশ কয়েক বছর পরে পদোন্নতি হয়ে পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) হন। এর ৬ বছর পর পদোন্নতি হয়ে উপরিদর্শক (এসআই) হন। জীবনের বেশিভাগ সময় খুব কম বেতনে চাকুরি করেছেন এই কথিত ওসি। চাকুরি থেকে অবসর যাওয়ার চার বছরে এসে পদোন্নতি হয়ে পুলিশ পরিদর্শক হন। তবে কখনো কোনো থানার ওসির দায়িত্ব তাকে দেয়া হয়নি। অথচ তিনি নিজেকে হামেশা ওসি পরিচয় দিয়ে বেড়ান। দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করাসহ ১০টির বেশি বাড়ি ও মার্কেট রয়েছে। তার এই অবৈধ সম্পদের ব্যাপারে দুদকে মামলাও হয়েছে। মামলাটির তদন্ত এমাসেই শেষ বলে দুদক ‍সূত্রে জানায়। তার অবৈধ সম্পদের মধ্যে গাজীপুরের কোনাবাড়ি আমবাগে ৮টি বাড়ি, কোনাবাড়িতে ১টি বাড়ি ও মাংস মার্কেট, গাজীপুর বর্ষা সিনেমা হলের পাশে ১টি বাড়ি, টাংঙ্গাইল মির্জাপুর জয়কালিবাড়ি মন্দির এবং কৃষি ব্যাংক ও উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় বাড়িসহ কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তি রয়েছে। তার এক আত্মীয় জানান, ১০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে ছেলে মামুনকে গাজীপুরের কোটায় এসআই পদে চাকুরি দেয়া হয়েছে। অথচ নিয়মনুযায়ী মামুনের চাকুরিটাও অবৈধ। পিতা আব্দুল হালিম মৃত্যুর পূর্বে একশতাংশ জমিও সোহরাব হোসেনের নামে রেখে যায়নি। অথচ জীবনের বেশিরভাগ সময় কনস্টেবল পদে এবং এসআই পদে কম বেতনে চাকুরি করে আজ অবৈধভাবে সম্পত্তির পাহাড় গড়ে তোলাছেন। তার এসব অবৈধ সম্পত্তির ব্যাপারে টাঙ্গাইল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর এক কর্মকর্তা জানান, সোহরাব হোসেনের নামে দুদকে মামলা হয়েছে। দুদকের ওই কর্মকর্তা জানান, চলতি মাসেই সোহরাবের মামলা তদন্ত শেষ হবে, আশা করছি এ মাসেই মামলাটি ঢাকায় পাঠানো হবে। এসব বিষয়ে একাধিকবার সোহরাব হোসেনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এ জাতীয় আরো খবর

নিখোঁজের একদিন পর বেতনা নদী হতে ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধার

নিখোঁজের একদিন পর বেতনা নদী হতে ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধার

ফেসবুকের অপ-প্রচারের তীব্র প্রতিবাদ জানাই

ফেসবুকের অপ-প্রচারের তীব্র প্রতিবাদ জানাই

নৌকায় ভোট দেয়ায় হামলা

নৌকায় ভোট দেয়ায় হামলা

কালিয়াকৈরে সরকারি ঘর বিক্রী ও ভাড়া, টাকা কাউন্সিলর সাইফুলের পকেটে

কালিয়াকৈরে সরকারি ঘর বিক্রী ও ভাড়া, টাকা কাউন্সিলর সাইফুলের পকেটে

নাটোরে এইচএসসি পরীক্ষার্থীকে অ্যাসিডে ঝলসে দিল বখাটেরা

নাটোরে এইচএসসি পরীক্ষার্থীকে অ্যাসিডে ঝলসে দিল বখাটেরা

বেনাপোল কাস্টমসে যাত্রীর কাছে  ৯ হাজার পিচ পাথর আটক

বেনাপোল কাস্টমসে যাত্রীর কাছে ৯ হাজার পিচ পাথর আটক